এই প্রতিবেদনটি প্রথম আলোর বিজ্ঞান প্রজন্ম বিভাগে ১৬ নভেম্বর,২০০৮ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে।
কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে জ্বালানি!
অতি সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক কার্বন সায়েন্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান কার্বন ডাই-অক্সাইডকে একটি রিসাইকেল বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত পণ্যের তালিকায় যুক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী সমস্যা সৃষ্টিকারী বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে জ্বালানি উৎপাদন করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
কার্বন সায়েন্স নামের এ উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠান দাবি করছে, তাদের এ প্রক্রিয়া একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে। কারণ, এখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড জৈব প্রভাবকের (বায়োক্যাটালিস্ট) সহায়তায় প্রক্রিয়াজাত করে তিনটি মৌলিক হাইড্রোকার্বনে পরিণত করা হবে, যার মধ্যে আছে মিথেন, ইথেন ও প্রোপেন। পরে এ তিনটিকে আবার উচ্চ মানসম্পন্ন জ্বালানি, যেমন−গ্যাসোলিন ও জেট ফুয়েল তৈরির কাজে লাগবে। কার্বন সায়েন্সের এই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সভাপতি ডেরেক ম্যাকলেইস বলেন, ‘আমরা পরীক্ষাগারে এ গবেষণা দেখে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে আছি। এখন অপেক্ষা করছি একটি ভালো ফলের জন্য। আরেকটি বিষয় হলো, এ প্রকল্পে আমার কোনো উচ্চ তাপমাত্রা কিংবা উচ্চ চাপ−কোনোটাই ব্যবহার করছি না।’
এই কার্বন ডাই-অক্সাইড পুনঃপ্রক্রিয়াকরণটি পাঁচটি ধাপে সম্পন্ন করা হবে। প্রথমে জৈব প্রভাবককে বিশুদ্ধ ও উৎপাদন করার পর তার ভেতরে কার্বন ডাই-অক্সাইড দেওয়া হবে। পরে এই বায়োক্যাটালিস্ট রিঅ্যাক্টরে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং বায়োক্যাটালিস্ট রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভেঙে তিনটি মৌলিক হাইড্রোকার্বনে পরিণত হবে এবং সবশেষে কনডেনসারের মাধ্যমে সেই হাইড্রোকার্বনগুলো উচ্চ মানসম্পন্ন জ্বালানিতে পরিণত করা হবে।
কার্বন সায়েন্স ছাড়াও বর্তমানে এ ধরনের আরও বেশ কিছু গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ে কাজ করছে। সানডিয়া ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা ঘনীভুত সৌরশক্তি ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে। সানশাইন নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান একটি প্রোটোটাইপ যন্ত্র তৈরি করেছে, যার সাহায্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে প্রথমে কার্বন মনোক্সাইডে পরিণত করা হয় এবং যা পরবর্তী সময়ে তরল জ্বালানির একটি অংশে পরিণত হয়।
জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি অন্যান্য কাজে ব্যবহার করার চিন্তাভাবনা করছেন বর্তমান সময়ের গবেষকেরা। যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মাইকেল নর্থ গবেষণা করেছেন কীভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যে পরিণত করা যায়। অধ্যাপক নর্থের মতে, কার্বন সায়েন্সের এই প্রকল্প যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করছে। কিন্তু এরই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন এভাবে, ‘তারা (কার্বন সায়েন্স) এখনো জানায়নি তাদের জৈব প্রভাবকগুলো কত দিন সক্রিয় থাকবে। যদি মাত্র এক দিন সক্রিয় থাকে, তাহলে প্রতিদিনের এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রক্রিয়াকরণের জন্য টন টন পরিমাণ এই জৈব প্রভাবকের প্রয়োজন হবে। তা ছাড়া এই জৈব প্রভাবকের স্থায়িত্ব ও বিষাক্ততা একটি লক্ষণীয় বিষয়; যেহেতু বায়োক্যাটালিস্ট থেকে সালফার ডাই-অক্সাইড এবং অনান্য বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য উৎপন্ন করে।
বিজ্ঞানী নর্থ এবং তাঁর সহকর্মীরা মিলে চেষ্টা করছেন কীভবে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে শিল্পে ব্যবহূত চক্রীয় কার্বনে পরিণত করা যায়। কারণ, নর্থ মনে করেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে জ্বালানি উৎপাদন করার চেয়ে একে শিল্পে ব্যবহার করাই শ্রেয়।
তবে সম্প্রতি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত জলবায়ুবিষয়ক এক কনফারেন্সে কার্বন সায়েন্সের এই কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে জ্বালানি উৎপাদনের প্রকল্প উষ্ণভাবে গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের পাশাপাশি কার্বন সায়েন্সের আরেকটি প্রকল্প, যেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে অধঃক্ষিপ্ত ক্যালসিয়াম কার্বনেট তৈরি হবে, সেটিকে উপস্থাপন করা হয়। এ প্রকল্পটি তৈরি করা হচ্ছে মূলত কাগজ, প্লাস্টিক ও ওষুধশিল্পের কথা মাথায় রেখে।
বিশ্বব্যাপী কার্বন ডাই-অক্সাইডের এই বৃদ্ধি নতুন করে আলোচনার টেবিলে ঝড় তোলে গ্লোবাল কার্বন প্রোজেক্টের প্রকাশিত প্রতিবেদন কার্বন বাজেট ২০০৭-এর ফলাফল দেখে। এখানে উল্লেখ করা হয়, বর্তমান অ্যাটমোস্কিয়ারে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনমাত্রা ৩৮৩ পিপিএম বেড়ে গেছে, যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানির দহন এক-তৃতীয়াংশ অবদান রাখছে।
কার্বন সায়েন্স তাদের এই নব উদ্ভাবিত প্রকল্প নিয়ে বেশ আশাবাদী। প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে, তাদের এ প্রকল্প কয়লা, গ্যাসচালিত প্লান্ট, তেল শোধনাগারসহ মূলত যেসব শিল্প বেশি পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন করে, সেগুলোতে স্থাপন করে নিঃসন্দেহে কার্বন ডাই-অক্সাইডের দুষণ অনেকাংশে কমানোর পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার ওপর চাপ কমাতে সক্ষম হবে।
মুহম্মদ আরিফিন সন্ধি